
বিশেষ প্রতিবেদন:
—————————
ভোলা সদরের চরসামাইয়া আর আলীনগর ইউনিয়নের অর্ধলাখ মানুষকে মাদকের আগ্রাসী ছোবলে গিলে খাচ্ছে। মাদক কারবারীদের তান্ডবলীলায় দুই ইউনিয়নের মানুষগুলো এখন এক ভয়ানক পরিস্থিতির মধ্যে দিনাতিপাত করছে। মাদকের বিরুদ্ধে কেউ টু-শব্দ করলে তাকে নির্মম পরিনতির শিকার হতে হয়। কাউকে ধারালো অস্ত্রের আঘাতে হতে হয় রক্তাক্ত-ক্ষতবিক্ষত ; কারোর ফলানো ফসল তাদের কব্জায় চলে যায়,কাউকে ভিটেমাটি ছেড়ে পালিয়ে বেড়াতে হয় বছরের পর বছর। আবার কেউ গ্রামে থাকতে হলে মাদক কারবারিদের তোষণ করা ছাড়া উপায়ন্তর থাকেনা। ভোলার চর সামাইয়া ও আলীনগর ইউনিয়নের আনাচে-কানাচে ঘুরে ভুক্তভোগী ও শ্রেনীপেশার মানুষের কাছ থেকে জানা গেলো সেখানকার মাদক কারবারী ও সন্ত্রাসীদের একক আধিপত্য,তান্ডবলীলা আর নারকীয় শোষণ-নিপীড়নের ভয়াবহতার এমন চিত্র।
স্থানীয়রা জানান,সেখানকার দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী ও মাদকের লাটভাইখ্যাত চর সামাইয়া তিন নম্বর ওয়ার্ডের ছিফলী গ্রামের বাসিন্দা মৃত নুরুল ইসলাম মিয়ার পুত্র মো: মাইনউদ্দিন ও তার সহোদর মো.জসিমের নেতৃত্বে দুই ইউনিয়নে রীতিমত মাদকের বিশাল রমরমা হাট বসে। এদের বিরুদ্ধে ভোলা থানা,কোর্ট ও মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের দায়েরকৃত বহু মামলা রয়েছে বলে সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমান রয়েছে। মাদকসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে বহুবার গ্রেপ্তার হয়ে কারাবাসের পর এরা জামিনে মুক্তি পেয়ে একই ব্যবসায় নিয়োজিত হয়ে পরে। তাদের বিরুদ্ধে চলমান মাদক ও নাশকতার মামলাগুলোতে এরা বিচারের মুখোমুখি থাকাকেও যেনো তোয়াক্কা করেনা। আলীনগর ও চরসামাইয়া ইউনিয়নের বাসিন্দারা গণমাধ্যমকে জানান,মাইনউদ্দিনের ইয়াবার অন্যতম এজেন্ট সুমন ও হাবিবুর রহমান হেজা’সহ প্রায় ডজনখানেক সহযোগী দুর্বৃত্ত পুরো দুই ইউনিয়নে মাদক ছড়িয়ে দিচ্ছে। প্রতিদিন সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার সাথে সাথেই সেখানে মাদকের হাটবাজার শুরু হয়ে যায়। এলাকাবাসী আরও জানায়, এ সিন্ডিকেটের নেটওয়ার্ক পরিবার ও আত্মীয়তার সূত্রে বিস্তৃত। মাইনুদ্দিনের বড় ভাই আলিনগর মাদ্রাসা বাজারের উত্তর পাশের বাসিন্দা মো.জসিম এবং রুহিতা আলিনগরের (মুছা বাপের মসজিদের পশ্চিম পাশে) মো. মিলন (পিতা: মৃত ছিদ্দিক) এই চক্রের সক্রিয় অংশীদার হিসেবে কাজ করছেন।
তথ্যমতে,চর সামাইয়ার ছিফলী,কাটাবন,সাহেব আলী বাজার,কলা বাগান,শান্তির হাট এবং আলী নগর ইউনিয়নের সাহেবের কাচারী,মাদ্রাসা বাজার,ডাকাতিয়া কান্দি এবং চৌমুহনী এলাকায় মাইনুদ্দিন-জসিম সিন্ডিকেটের মাদকের রমরমা ব্যবসা চলছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে চর সামাইয়া ইউনিয়নের শান্তির হাটের একাধিক ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ গণমাধ্যমকে জানান,বিগত আওয়ামী স্বৈর জমানা থেকে এরা ওই জনপদগুলোতে মাদকে সয়লাব করে ফেলেছে। আলী নগরের সাহেবের কাচারী এলাকার বাসিন্দারা জানান,জুলাই বিপ্লবের পর আওয়ামী ক্যাডার মাইনুদ্দিন-জসিম সিন্ডিকেট কিছুদিন গা ঢাকা দিয়ে থাকলেও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর পরই এরা জার্সি বদল করে ফের মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। এরা স্থানীয় বিএনপি সমর্থিত কিছু বিপদগামী ব্যাক্তির সেল্টার নিয়ে নতুন মোড়কে সেই পুরনো মাদক ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে বলে বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় সুত্রগুলো আরো জানিয়েছে-মাদক ব্যবসার বিরুদ্ধাচারন করায় এই চক্রের সন্ত্রাসীরা চরসামাইয়া ইউনিয়নের বহু বনেদী পরিবারের সম্মানীয় ব্যক্তিদেরকে শুধু সামাজিক হেনস্তাই নয়; তাদেরকে কুপিয়ে রক্তাক্ত করে হত্যার চেস্টা পর্যন্ত করেছিলো। স্বৈরশাসকের সেই জাহেলী জমানার পরিবর্তন ঘটলেও সন্ত্রাসী ও মাদকের মহারাজা মাইনুদ্দিন-জসিম আগের মতই বহাল তবিয়তে আছেন। চরসামাইয়া ইউনিয়ন বিজেপি সাধারণ সম্পাদক এবং ওই ইউপি’র চেয়ারম্যান পদ প্রার্থী মামুন মুন্সী সাংবাদিকদের বলেন-মূলত: এসমস্ত মাদক কারবারিদের কোনো দল নেই। এরা নিজেদের মাদক ব্যবসার প্রসার ঘটাতে জঘণ্যকর্ম ও নিজেদের মতই যেকোনো দলের অসৎ ব্যক্তিদের সাথে আতাত করতে কুন্ঠাবোধ করেননা। এদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার এখনই মোক্ষম সময় বলে মনে করে বিজেপির এনেতা।
আলীনগর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন বিএনপি সভাপতি মো.জামাল উদ্দিন বলেন-আমরা গ্রামের যুবক,ছাত্রজনতা ও মুরুব্বিদের সাথে নিয়ে খুব শীঘ্রই মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে চিরুনি অভিযান শুরু করবো; সেক্ষেত্রে কে কোন দলের তা বিবেচনা করা হবেনা।
বর্তমানে এসব মাদক কারবারিদের দৌরাত্ম আর সন্ত্রাসলীলা থেকে গ্রামের শান্তিপ্রিয় মানুষগুলো মুক্তি চায়।
তাই এলাকায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ও শান্তিশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে এই সংঘবদ্ধ মাদক সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে দ্রুত কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য পুলিশ প্রশাসন ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের জরুরি হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন দুই৷ ইউনিয়নের ভুক্তভোগী অর্ধলাখ মানুষ।
ভোলায় মাদকের এমন ভয়াল বিস্তার নিয়ে গণমাধ্যমের মুখোমুখি হন ভোলার পুলিশ সুপার মো.শহিদুল্লাহ কাউছার- বিপিএম (বার)। তিনি সাংবাদিকদের বলেন,ভোলায় মাদক ও মাদক কারবারিদের নির্মূল করতে প্রতিদিনই পুলিশ বাহিনী সাঁড়াশী অভিযান চালাচ্ছে। তাছাড়া মাদকের আগ্রাসী ছোবল থেকে যুব সমাজকে রক্ষা করতে প্রতিটি ইউনিয়ন-ওয়ার্ড ভিত্তিক জনপ্রতিনিধি,স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী এবং শ্রেনীপেশার মানুষকে নিয়ে সচেতনতা সভা করা হচ্ছে। মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অবলম্বন করে পুলিশের এই অভিযান ধারাবাহিকভাবে চলবে বলেও জানান,জেলা পুলিশের এই
শীর্ষকর্তা।
এদিকে মাদক কারবার আর সন্ত্রাসী কর্মে জড়িতের বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযুক্ত মাইনুদ্দিন ও জসিম বলেন-এগুলো সবই মিথ্যা এবং ষড়যন্ত্রমুলক। তাদের বিরুদ্ধে একটি গ্রুপ এধরণের সাজানো ঘটনা তৈরি করে শক্রতা করছে বলে দাবী করেন তারা।












